যেভাবে আপনি একটি ভালো উপস্থাপনা করতে পারেন

যেভাবে আপনি একটি ভালো উপস্থাপনা করতে পারেন

বর্তমান সময়ে মোটামুটি সকলেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে একটি ভালো উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশন করতে হয়। আমরা অনেকেই আছি যারা এই উপস্থাপনাকে ভীষণভাবে ভয় করি। এই ভয়ের জন্য তো অনেকে উপস্থাপনা করা থেকেই বিরত থাকি। কিন্তু এভাবে বিরত থেকে গেলে তো পরবর্তী সময়ে আমাদের নিজেদেরই সমস্যায় পড়তে হবে।

হতে পারে শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক আপনাকে কম মূল্যায়ন করবেন অথবা কর্মক্ষেত্রে আপনার গুরুত্ব কমে যাবে। কারণটিও খুব স্বাভাবিক। আপনাকে যে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে, তা আপনি ঠিকমতো করতে পারছেন না।

বরং উপস্থাপনার কথা শুনলে আপনার শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লজ্জা বোধ করেন এই ভেবে যে, “যদি আমি ভুল করে ফেলি!” জনসম্মুখে কথা বলার মতো সক্ষমতা যদি আপনার না থাকে, তবে বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা সত্যিই খুব কঠিন।

শুধুমাত্র নিজের ভালোর জন্য হলেও, উপস্থাপনার বিষয়টি আমরা কোনোমতেই এড়িয়ে যেতে পারবো না। আর উপস্থাপনা যখন করতেই হবে, নিশ্চয়ই তা ভালো হওয়া চাই। তাহলে চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক একটি ভালো উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশনের এ টু জেড

১. শ্রোতা ও দর্শকমণ্ডলীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিন এবং তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন

এই ভুলটি আমরা প্রায় সবাই-ই করে থাকি। উপস্থাপনা দেয়ার জন্য মঞ্চে উঠার পর আমরা সবদিকে তাকাই, শুধুমাত্র দর্শকদের দিকে ছাড়া। অনেকে আবার সারাক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে থাকি।

কিন্তু এই জিনিসটি মোটেও আমাদের দর্শক ও শ্রোতারা আমাদের থেকে আশা করেন না। আপনি যাদের কাছে আপনার বিষয়টি উপস্থাপন করছেন, তাদের দিকে অবশ্যই তাকাতে হবে। দর্শকরা যদি মনে করে যে, আপনি তাদের সাথে কথা না বলে অন্য কারো সাথে বলছেন, তাহলে তারা আপনাকে গুরুত্ব দেবে না!

আপনাকে অবশ্যই দর্শকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে। তাহলে আপনি কী বলছেন, তা শোনার জন্য দর্শকরা আগ্রহ পাবে এবং সেই সাথে আপনার উপস্থাপনাও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

২. শ্রোতারা কী শুনতে চায়, সেটার উপর অধিক গুরুত্ব দিন

উপস্থাপনা তৈরি করার সময় আমরা যেই ভুলটি সবচেয়ে বেশি করি তা হলো, শ্রোতারা কী শুনতে চায় তা গুরুত্ব না দিয়ে, আমরা কী বলতে পারবো, সেটার দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমরা তো উপস্থাপনা তৈরি করছি আমাদের শ্রোতাদের জন্য, নিজেদের জন্য না।

শ্রোতারা আমাদের কাছ থেকে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুনতে চাচ্ছেন, তা যদি না পান, তবে তারা নিশ্চয়ই হতাশ হবেন। এর ফলে শ্রোতারা আমাদের উপস্থাপনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। তাই উপস্থাপনা তৈরি করার সময় আমাদের শ্রোতারা কী চায়, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।

৩. উপস্থাপনার মূল বিষয়ের সাথে লেগে থাকুন

আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নিলাম, আমরা বর্তমানের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে উপস্থাপনা করছি।

তাহলে আমাদের মূল বিষয়গুলো হবে, রোহিঙ্গারা কেন বাংলাদেশে আসছে, তাদের কী কী সমস্যা হচ্ছে, তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য কীসব পদক্ষেপ নেয়া যায়- এরকম।

স্বভাবতই এখানে আলোচনার জন্য অনেক ইতিহাসমূলক কথা উঠে আসবে। এখন আমরা যদি ইতিহাস টানতে গিয়ে অন্য এক ইতিহাসে চলে যাই, যা রোহিঙ্গা সমস্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবে তা আমাদের শ্রোতাদের কাছে ভালো লাগবে না। তারা আমাদের উপস্থাপনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং বিরক্ত হয়ে অপেক্ষা করবে উপস্থাপনা শেষ হবার জন্য।

তাই উপস্থাপনা তৈরির সময় আমাদের এই খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যেনো উপস্থাপনার মূল বিষয়ের সাথে লেগে থাকি।

৪. হেসে কথা বলুন

আমাদের দর্শক এবং শ্রোতারা চায়, যাতে আমরা তাদের সাথে হেসে কথা বলি। উপস্থাপনার মঞ্চে উঠার পর অনেক সময় আমরা মুখ গোমড়া করে রাখি।

এটা দর্শকবৃন্দ আমাদের থেকে আশা করেন না। কাজটা অনেক কঠিন হলেও, উপস্থাপনাকে প্রাণবন্ত করার জন্য আমাদের হেসে কথা বলা উচিত। প্রথমেই বলেছি যে, অনেকসময় আমরা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে কথা বলি না।

এটা আমাদের ব্যাপারে দর্শকদের কাছে একটি নেতিবাচক ধারণা দেয়। আমরা যদি দর্শকদের সাথে হেসে কথা বলি, তাহলে আমাদের উপস্থাপনা যেমন দর্শকদের ভালো লাগবে, ঠিক তেমনি দর্শকদের হাসিমুখ দেখে আমরা কথা বলার আগ্রহ পাবো।

কথা বলার সময় আমরা যদি এটা খেয়াল রাখি যে, আমরা দর্শকদের সামনে বক্তৃতা না দিয়ে, তাদের সাথে আলোচনা করছি, তাহলে কাজটি আরও সহজ হয়ে যাবে।

৫. জোরালোভাবে উপস্থাপন শুরু করুন

উপস্থাপনা শুরু করার সময় আমরা বেশিরভাগ সময় একটি কথাই বলি। “আমার নাম ‘অমুক’। আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো, “____”।” এটি খুবই সাধারণ এবং শ্রোতারা একই কথা শুনে অনেকসময় বিরক্ত হয়ে যায় কিংবা আগ্রহ পায় না।

উপস্থাপনার শুরুতেই দর্শকের আগ্রহ ধরে নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য অনেকেই পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কোনো একটি গল্প দিয়ে উপস্থাপনা শুরু করার জন্য। মানুষ স্বাভাবিভাবেই গল্পের প্রতি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে।

গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে! তাই শুরুতেই দর্শকদের আগ্রহ পাওয়ার জন্য আমরা একটি মজার গল্প দিয়ে উপস্থাপনা শুরু করতে পারি। এরপর নাহয় নিজের পরিচয় ও আলোচ্য বিষয় তুলে ধরলাম।

Source: Nahiyan Siyam

৬. ১০-২০-৩০ এর নিয়ম

একটি ভালো উপস্থাপনা করতে, তা নির্ভর করে দর্শকদের আগ্রহের উপর। দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য উপস্থাপনাও সুন্দর করে তৈরি করে আনা উচিত। উপস্থাপনার স্লাইড তৈরি করার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত।

দর্শকরা যাতে কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত না হয়ে যায়, সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। এ কারণে উপস্থাপনার সময় ১০টির বেশি স্লাইড বানানো উচিত নয়। উপস্থাপনা যাতে ২০ মিনিটের বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা খুবই জরুরি।

২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে কথা শুনতে থাকলে দর্শকরাই অনেকসময় বিরক্ত হয়ে যায়। স্লাইড তৈরির সময় আমরা অনেকক্ষেত্রেই সব কথা স্লাইডে দিয়ে দিই। এটি দেখতে অত্যন্ত বাজে দেখায়।

স্লাইডে শুধুমাত্র আলোচ্য বিষয়ের কথা উল্লেখ রাখতে হয়। বেশিরভাগ কথা আমাদের মুখে বলা উচিত। স্লাইডের লেখার আকার ৩০ এর কম করা উচিত নয়।

‘৩০’ আকারের লেখা দিয়ে শুধু মূলকথা তুলে ধরলে দর্শকদের বুঝতে সুবিধা হবে, আমরা কী নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। এই ১০-২০-৩০ এর নিয়ম মেনে উপস্থাপন করলে দর্শকরা আমাদের কথায় আগ্রহ পাবে এবং উপস্থাপনটিও সুন্দর হবে।

৭. মুখের ভাষা এবং শারীরিক ভাষার সুন্দর ব্যবহার নিশ্চিত করুন

মুখের ভাষার পাশাপাশি শারীরিক ভাষাও সঠিক হওয়া জরুরি। আমরা যদি এক জায়গায় সোজা দাঁড়িয়ে থেকে টানা কথা বলে যাই, তবে জিনিসটা সুন্দর দেখায় না।

মঞ্চে সম্ভব হলে আমাদের সামান্য হাঁটাচলা করা উচিত, হাত নাড়িয়ে কথা বলা উচিত, দর্শকদের প্রশ্নের সময় প্রশ্নকর্তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা উচিত। তাহলে আমাদের উপস্থাপনাটি অনেকটা প্রাণবন্ত মনে হবে।

এগুলো হলো উপস্থাপনা সুন্দর করার জন্য জানা থাকা উচিত এমন কিছু উপায়। উপস্থাপনা শুরুর আগে আমাদের মধ্যে অনেক ভয় কাজ করে। আমাদের উচিত এ সময় নিজেকে যতটা সম্ভব নিশ্চিন্ত রাখা।

বাড়তি কোনো চাপ না নিয়ে আমাদের উচিত সময়টা উপভোগ করা।

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!